বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন

পীরগঞ্জের একজন রক্তের ফেরীওয়ালার গল্প !

আবু তারেক বাঁধন,উকনি ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রক্তের আহ্বানে প্রায়ই তাঁর পোস্ট নজরে আসে। কখনো অভূতপূর্ব সাড়া পান, আবার কখনো কখনো নিরাশ হন। তবে শুধু ফেসবুকে জানিয়েই বসে থাকেন না। রক্তের গ্রুপ জানা আছে এমন পরিচিত মানুষকে ফোন করেন। রক্তদানে রাজি হলে সংগ্রহ করেন। তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টায় প্রায়ই মুমূর্ষু রোগীরা রক্ত পেয়ে বেঁচে যান।

এই উদ্যোগ যাঁর, তিনি মহিদুর খান। পেশায় একজন বেকার। ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থানায় ‘প্রজন্ম তরুণ সংঘ’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ কাজ করেন মহিদুর খান।পীরগঞ্জের প্রতিটি ক্লিনিকে এবং সরকারি হাসপাতাল এর রোগীর সেবা করাই মহিদুর খানের কাজ, তবে পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছেন কিছু বাড়তি দায়িত্ব।

Image may contain: 11 people, including Md Uzzal Rahman and Mohidur Khan, people standing and outdoor

এই বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার ঝোঁকটা ছোটবেলার। মহিদুর খানের বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। তাঁর বেড়ে ওঠা অনেকটা প্রতিকূল পরিবেশে।মহিদুর খান বলছিলেন, ‘মা-বাবা কেউই পড়াশোনা করেননি। আমরা ৪ ভাইবোন। বড় ভাই অনেক আগেই বিয়ে করেন, বড় বোনেরও বিয়ে হয়ে যায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। তারপরও আমরা ভাই বোনেরা চেয়েছি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে।’ রীতিমতো যুদ্ধ করেই পড়াশোনা করছেন,এবং এখনো করতে হচ্ছে মহিদুর খান কে। পড়াশোনার ফাঁকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন অসহায় মানুষের। মাধ্যমিক শেষে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এ অধ্যয়নরত আছেন তিনি। স্বল্প বেতনের চাকরি থেকে মাস শেষে যা হাতে আসে, তা দিয়ে নিজে চলেন, মায়ের চিকিৎসা এবং সংসারের খরচ চালান।

Image may contain: 21 people, including Sujan Vps, দৈনিক দেশ বার্তার সংবাদ and Mohidur Khan, people standing, crowd and outdoor

আর রক্ত নিয়ে কাজ তো আছেই। মহিদুর খানের রক্তদান শুরু হয় যখন তিনি মায়ের চিকিৎসার জন্য এদিক সেদিক ছুটতে থাকেন,তখন দেখেন তার মতোই অনেক অসহায় ব্যক্তি নিজের আপনজনের জন্য রক্ত লাগবে বলে খোজ করছেন,এবং তা দেখেই তিনি কাজ শুরু করে দিলেন বিনামূল্যে জরুরী রক্ত দান সেবা সে সময়। সেটা ২০১৪ সালের কথা। মহিদুরখান বলছিলেন, ‘দরিদ্র রোগীরা যখন বিনা মূল্যে রক্ত পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাঁদের হাসিমুখ দেখার মতো প্রশান্তির কিছু নেই।’ শুধু রক্ত সংগ্রহের কাজ নয়, নিজেও রক্ত দেন নিয়মিত। আর এই রক্তদানের সঙ্গে মহিদুর খানের প্রিয় কাজ গরীব মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা করা এবং সমাজের বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজ করা। এখন পর্যন্ত ২০০০ ব্যাগ এর অধিক রক্ত সরবরাহ করে দিয়েছেন বিনামূল্যে। তিনি সবসময়ই রোগীর আত্মীয় স্বজনদের বলেছেন আজ আপনার প্রিয়জনের জন্য রক্ত নিচ্ছেন, কাল অন্য কারোও জন্য আপনি রক্ত দিতে প্রস্তুত তো? এভাবেই তিনি অনেককে স্বেচ্ছায় রক্ত দানের জন্য উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

Image may contain: 6 people, including Mohidur Khan, people sitting

তিনি গর্ভবতী মহিলার অগ্রিম রক্তের জন্য পরিবারের সদস্যদের বার্তা দিয়ে গেছেন এবং বিভিন্ন সচেতনতা মূলক পোস্টার ও ব্যানার এবং লিফলেট বিতরণ করেছেন। তার এই নিরলস প্রচেষ্টা সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারী প্রজন্ম তরুণ সংঘের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ৩০০+ অনলাইন সদস্য এবং ২০০ এর মতো অফলাইন সদস্য ও ১৪ জন কার্যনির্বাহী সদস্য নিয়ে তার নিরলস সংগ্রামের পথচলা। এই মহান পথের দিকে চলতে চলতে তাকে অনেক কথা এবং গ্লানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। কেউ বলেছে রক্তের দালাল,কেউবা বলেছে রক্ত ব্যবসায়ী আবার কেউ বা রক্ত চোষা বলে পেছনে সমালোচনা করতে কুন্ঠাবোধ করেনি।কিন্তু তিনি তাদের এইসব সমালোচনাকে গায়ে না মেখে নিজের পিথকে সুগম করেছেন কার্যনির্বাহী সদস্যদের সাথে নিয়ে। যারা তার অনুপ্রেরণা যোগাতে সাহস দিয়ে গেছেন। কিন্তু সমাজ, পরিবেশ এবং আমরা তাকে মূল্যায়ন করতে পারিনি। চেষ্টাও করিনি সবসময়ই নিচু করে, অবহেলা আর অবজ্ঞা করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছি। কিন্ত নির্মমভাবে একটা সত্য চাপা পড়েই থাকে আজ পর্যন্ত কেউ তাকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে, বাহবা কিংবা অনুপ্রেরণা দিতে পারিনি আমরা।

Image may contain: 2 people, including Mohidur Khan, people smiling, beard and indoor

প্রয়োজনে কিন্তু তাকেই পার্সোনালি মেসেজ কিংবা ফোনে বলেন যে মহিদুর ভাই আমার এই গ্রপের,ঐ গ্রুপের রক্ত লাগবে। কিন্তু তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেননি। যথাযথ চেষ্টা করে গেছেন এবং করে যাচ্ছেন৷ আর আমরা প্রয়োজন ফুরালে তাকে ধন্যবাদ দিতেও কষ্ট অনুভব করি। নিজের ফোনের বিল খরচ করে দিন-রাত রক্তের ডোনার খুঁজে দেওয়া, রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ করা সেই প্রিয় মানুষটিকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। সত্যিকারের একজন মানুষ হিসেবে সম্মান জানাই আপনাকে। হয়তো সম্মাননা জানানোর কোনো সামর্থ আমার নেই, তবে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবো আপনাকে সহযোগিতা করার। লাল গোলাপের রক্তিম শুভেচ্ছা রইলো ভাই। অতি ক্ষুদ্র পরিসরে অনেক বড় এবং মহৎ কিছু করে দেখিয়েছেন আপনি। অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিরা তবুও সমালোচনা করে যাবে এই নির্মম পরিহাস মেনে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে আপনাকে। অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো আপনার জন্য।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




কপি পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। উত্তরের কন্ঠ[ডট]কম
themebazaruttorerka234
error: Content is protected !!